জৈন সংঘ (Jain Sangha)
জৈন সংঘ (Jain Sangha)
সংঘ শব্দটির অর্থ হল একতা বা Unity. সংঘ বলতে বোঝায় "The boned of association among Monks." জৈন ধর্মের ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর ধর্ম প্রচারের জন্য জৈন শ্রমন সংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। বস্তুতপক্ষে মহাবীরের আবির্ভাব এর পূর্বে উত্তর ভারতে জৈনধর্মের অস্তিত্ব ছিল সে কথা আমরা নানা জৈন ধর্মগ্রন্থ গুলি থেকে জানতে পারি। কিন্তু এই সময় জৈন সংঘ গড়ে উঠেছিল কিনা সে কথা যেমন বলা যায় না, সেরূপ এই সময় সংঘ গড়ে উঠলেও তা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি বলে মনে হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে অর্থাৎ দ্বিতীয় নগরায়নের যুগে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের সূচনা হয়। এই প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের মধ্যে জৈন ধর্ম ছিল অন্যতম। জৈনদের মতে বহু প্রাচীনকাল থেকেই 24 জন তীর্থঙ্কর বা মুক্তির পথ নির্মাতা জৈন ধর্ম প্রবর্তন ও প্রচার করে গেছেন। সর্বপ্রথম তীর্থঙ্ক করছিলেন আদিনাথ বা ঋষভ দেব এবং সর্বশেষ তীর্থঙ্কর হলেন মহাবীর।
জৈন ধর্মগ্রন্থ ও শাস্ত্রগুলি মূলত জৈন ধর্মাবলম্বীদের উদ্ভব এবং বিস্তার সংক্রান্ত তথ্যের উপর সামান্য আলোকপাত করে। এই ধর্মগ্রন্থ গুলিতে মহাবীর এবং তাঁর পূর্ববর্তী তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মতবাদ ও নীতি সম্পর্কীয় বেশ কিছু তথ্যের আলোচনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। পার্শ্বনাথ যে ধর্মমত প্রচার করেছিলেন পরবর্তীকালে জৈন ভিক্ষুদের মধ্যে এই ধর্ম চরণের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা দেয়। মহাবীরের সময় উত্তর ভারতের কয়েকজন রাজা এবং বেশ কিছু জৈন ভিক্ষু জৈনধর্ম অনুশীলন করতেন, সেই কারণে ঐ রাজাদের এবং জৈন ভিক্ষুদের সাহায্যে মহাবীর সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন ও জৈন ধর্ম প্রচার করতে থাকেন।
জৈন সংঘ প্রতিষ্ঠার মূল কারণ ছিল জৈন শ্রমনদের বর্ষাবাস, অর্থাৎ বর্ষাকালে জৈন শ্রমনরা নির্দিষ্ট একটি স্থানে বসবাস করতেন। বর্ষার চার মাস জৈন শ্রমনরা সংঘে বসবাস করতেন এবং বছরের বাকি সময়টা পরিব্রাজকের বৃত্তি গ্রহণ করতেন। জৈন শ্রমনরা কোন গৃহস্থর বাড়িতে অবস্থান করতেন না। কিন্তু বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সেরকম কোনো বাধা ছিল না। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মাছ-মাংস খেতে পারত জৈন শ্রমনদের তার বারণ ছিল।
24 তীর্থঙ্কর মহাবীর ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। তিনি জৈন সংঘকে দৃঢ় ভীত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি সংঘ পরিচালনার দায়িত্ব তার প্রধান শিষ্য বা গণধরদের হাতে তুলে দেন। প্রতি গণধর এর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ছিল। মহাবীরের মৃত্যুর পর তার শিষ্য ইন্দ্রভূতি সংঘপ্রধান বা গণধর হয়েছিলেন তিনি প্রায় 12 বছর সংঘের হাল ধরে রেখেছিলেন। তারপর সুধামা নামে এক ভিক্ষু গনধর পদে নিযুক্ত হন। কল্পসূত্রে সুধামা থেকে শুরু করে প্রায় 33 জন গণধর এর ইতিহাস পাওয়া যায় এই তালিকাটি শ্রেষ্ঠ গণধর ভদ্রবাহু দ্বারা রচিত।
বৌদ্ধদের নারী ও পুরুষদের জন্য একই সংঘ ছিল। জৈনদের ক্ষেত্রে পৃথক সংগঠন ছিল। অর্থাৎ জৈন সংঘে নারী এবং পুরুষ একসঙ্গে থাকত না। নারী ও পুরুষ উভয়দের জন্য আলাদা আলাদা সংঘ ছিল। বৌদ্ধ সংঘের উপাসক উপাসিকারা যেন পরবাসী ছিলেন। জৈন সংঘে গৃহী ভক্তদের বিশিষ্ট স্থান ছিল। কয়েকটি বিষয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে জৈন সাধুদের বেশ মিল ছিল।
বৌদ্ধ ধর্মে ত্রিরত্ন বলতে বোঝায়- বুদ্ধ ধর্ম এবং সংঘ। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মে সংঘ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু জৈন ধর্মে সংঘ এতটা গুরুত্ব পাইনি। জৈন ধর্মে সংঘগুলি মূলত অস্থায়ী বসবাসের জন্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বৌদ্ধ সংঘ গুলি পরবর্তীকালে শিক্ষা কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় কিন্তু আমরা কোন জৈন সংঘ কে সেরকম কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাই না। সুতরাং এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে জৈন সংঘ গুলি সীমাবদ্ধতা।
জৈন ধর্ম প্রসারের ক্ষেত্রে জৈন সংঘ গুলি যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। এই সংঘ গুলি পূর্ব ভারতের বেশিরভাগ স্থানেই লক্ষ্য করা যায়। জৈন ধর্মের সবথেকে বেশি প্রভাব বিস্তার হয়েছিল বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই অঞ্চলগুলিতে আমরা অনেক জৈন সংঘের অবস্থান লক্ষ্য করি। এখনকার গয়া, রাজগৃহ, নালন্দা, পাবাপুরী, পাটলিপুত্র এবং বুদ্ধগয়া অঞ্চলে বেশ কিছু জৈন সংঘের অস্তিত্ব ছিল। বাংলায় পাহাড়পুর, তাম্রলিপ্ত, উড়িষ্যার উদয়গিরি, খন্ডগিরি প্রভৃতি অঞ্চল গুলিতে জৈন সংঘ গুলি গড়ে উঠেছিল।
মহাবীরের সময় থেকেই জৈন সংঘতে বারবার বিভেদ দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য মহাবীরের জীব দশা আজীবক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা মংখলীপুত্র গোসালা জৈন সংঘ থেকে পৃথক হয়ে একটি আলাদা দল গড়ে তুলেছিলেন। এরপর জামালি সংঘের মধ্যে গোলযোগের সৃষ্টি করে মহাবীরের বিরোধিতা করেন এবং সংঘ ছেড়ে চলে যান। এর দু'বছর পর তিষ্যগুপ্ত নামে অপর এক ভিক্ষু কয়েকটি নির্দিষ্ট নীতি নিয়ে মহাবীরের সাথে তর্কে অবতীর্ণ হন এবং পরে সংঘ পরিত্যাগ করেন। এইভাবে জৈন সংঘে বিভেদ হতে থাকে।
মহাবীর তার শিষ্যদের বিবস্ত্র অবস্থায় থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন কিন্তু পার্শ্বনাথের অনুগামীরা শ্বেতবস্ত্র পরিধান করত। এর ফলে সংঘের মধ্যে এই নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি হয়। মহাবীরের মৃত্যুর পর ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে একদল জৈনসাধু দক্ষিণ ভারত চলে যান তারা বস্ত্রহীন অবস্থায় থাকতে শুরু করেন। অপরদিকে স্থুলভদ্রের নেতৃত্বে একদল জৈন ভিক্ষু মগধ অঞ্চলে থেকে যান এবং তারা শ্বেতবস্ত্র পরিধান করত। ফলে দীর্ঘ 12 বছর পর ভদ্রবাহুরা মগদে ফিরে এলে এখানকার জৈন ভিক্ষুদের সাথে মতবিরোধ ঘটে এবং শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর নামের দুটি শাখায় ভাগ হয়ে পড়ে।
জৈনধর্ম শাস্ত্র অনুযায়ী মোট 8 বার জৈন সংঘ বিভেদ হয়েছে। কিন্তু শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর এর মত এত বড় ফাটল আগে হয়নি। জৈন সংঘের মধ্যে বারবার এই বিভেদ সংঘের সীমাবদ্ধতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিল আর এই বিভেদের কারণেই জৈন ধর্মে সংঘ অতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। যতটা বৌদ্ধ ধর্মে হয়েছিল।
জৈন ভিক্ষুদের বর্ষাবাস ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে মহাবীর জৈন সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু বারবার সংঘ বিভেদের ফলে জৈন সংঘ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্র হিসেবেও সংঘ গুলি গড়ে উঠতে পারেনি। এগুলি শুধুমাত্র জৈনদের বসবাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
Posted by-Abhisek Dutta

Comments
Post a Comment